নির্বাচনে ডাব্বা মেরে কোনো খারাপ লাগল না: তারেক রহমান

গাজীপুর নিউজ ২৪|| প্রকাশিত: ০৯:৫৯ এম, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬  
নির্বাচনে ডাব্বা মেরে কোনো খারাপ লাগল না: তারেক রহমান

আম-মধুর ব্যবসা ও সাদামাটা জীবনকে উপভোগ করতে ভালোবাসেন বলে জানিয়েছেন আমজনতা দলের সদস্যসচিবমো. তারেক রহমান

তিনি জানিয়েছেন, পেশাগতভাবে তিনি আইটি ব্যবসায় জড়িত ছিলেন, তবে তার বাবা-মা চাইলেন তিনি সরকারি চাকরি গ্রহণ করুন। তাঁদের ইচ্ছা অনুযায়ী সরকারি চাকরির জন্য বহুবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু বারবার ব্যর্থ হয়েছেন।

তারেক রহমান আরও স্মরণ করান, তখন শিক্ষক নিয়োগে ৮৪ শতাংশ কোটা, রেলওয়েতে ৪০ শতাংশ পারিবারিক বা পৌষ্য কোটা এবং প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা ছিল। এই সব অভিজ্ঞতা তাকে সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত করেছিল।

সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে একটার দিকেতারেক রহমানএক ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে নিজের অনুভূতি ও কর্মকাণ্ডের বিবরণ দেন। সেখানে তিনি ব্যক্তিগত সংগ্রাম ও সামাজিক ন্যায্যতার বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

তারেক বলেন, “নিজের ব্যক্তিগত জীবনে বারবার নিরাশ হয়ে, সরকারের চাকরি ও সামাজিক ব্যবস্থার জটিলতায় আটকে পড়ার পর আমি কোটা সংস্কারের জন্য উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এটি শুধু আমার নয়, এমনকি সমগ্র সমাজের জন্য একটি ন্যায্যতার প্রয়াস হিসেবে শুরু হয়েছিল।”

তিনি আরও জানান, কোটা সংস্কারের আন্দোলন চলাকালীন সময়ে অনেকে এটিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন এবং কখনো কখনো মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে শত্রুতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি বর্তমান সরকারও এই আন্দোলনকে “রাজাকারদের প্রভাবে পরিচালিত” হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে।

তবে তাঁর দাবি, আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা। “আমরা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য কিছুটা কোটা রেখেছিলাম, নারীদের জন্য কিছুটা সংরক্ষণ করেছিলাম, পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এবং পাহাড়ি অঞ্চলের অনগ্রসর সম্প্রদায়ের জন্যও যথাযথ অংশ রাখার পরিকল্পনা করেছিলাম। মোটমাট ১৫ শতাংশ কোটার প্রস্তাব দিয়েছিলাম যাতে সকল প্রান্তের মানুষের জন্য ন্যায্য সুযোগ তৈরি হয়।”

তারেক রহমানের এই পোস্টে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, কোটা সংস্কারের আন্দোলন ছিল একেবারে সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক, যা কোনো একটি শ্রেণি বা গোষ্ঠীর বিরোধিতার ভিত্তিতে নয়, বরং সামাজিক ন্যায্যতা, অন্তর্ভুক্তি এবং সমতার লক্ষ্যে শুরু হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, “আমাদের লড়াই ছিল ন্যায়বিচারের জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরো কোটা ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায়শেখ হাসিনাসরকারের জিদ এক বড় ক্ষতি করে। কোটা পদ্ধতি না থাকায় সমাজের অনগ্রসর অংশ বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়।”

তারেক রহমানের মতে, অনগ্রসর জেলা ও অঞ্চলের মানুষের জন্য জেলা ভিত্তিক বরাদ্দ রাখা অপরিহার্য। তিনি বলেন, “কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট—এইসব এলাকায় বহুবার গিয়েছি। সেখানে মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে জীবনযাপন করছে। তাদের জন্য অন্তত কিছুটা সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যদি তা না দেওয়া হয়, তবুও জনসংখ্যার অনুপাতে তারা তাদের অঞ্চলের রিক্রুটমেন্টে ন্যায্য অংশের অধিকার রাখে।”

তিনি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন, সামাজিক ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে কোটা বা বরাদ্দ নিশ্চিত করা না হলে দেশের পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলো আরও অসুবিধার মুখে পড়বে। এই দর্শন তার কোটা সংস্কারের আন্দোলনের মূল ভাবনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।

আমজনতা দলের সদস্যসচিববলেন, “কোটার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন বৈজ্ঞানিক ও আধুনিকভাবে হওয়া উচিত, যাতে সমাজের অনগ্রসর অঞ্চল ও গোষ্ঠীর জন্য যথাযথ বরাদ্দ নিশ্চিত থাকে। আমরা কখনই চাইনি প্রাইমারী শিক্ষক নিয়োগে নারী কোটা সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হোক। গ্রামাঞ্চলের মেধাবী বোনদের জন্য অবশ্যই অগ্রাধিকার থাকা উচিত।”

তিনি প্রশ্ন তোলেন, “কোটা কি ৬০ শতাংশ নারী এবং ২০ শতাংশ পৌষ্য রাখার মানদণ্ড অনুযায়ী ছিল? এক ধাক্কায় যদি সেই ৬০ শতাংশ নারী কোটা শূন্য করা হয়, তাহলে কি সেটি ন্যায়সঙ্গত? আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, কিন্তু সেই সুযোগ বাস্তবে দেওয়া হয়নি। আন্দোলনের বিরোধিতা বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করার কারণে, রাগ ও ক্ষোভের প্রভাবে সব ধরনের কোটা একসাথে বাতিল করা হয়েছে।”

তারেক রহমানের এই বক্তব্যে স্পষ্ট হচ্ছে, কোটা সংস্কারের আন্দোলন মূলত অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়সঙ্গত সুযোগ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা ছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়নের পথে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাধা পরিস্থিতিকে উল্টোদিকে চালিত করেছে।

তিনি আরও ব্যক্ত করেছেন, “২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের পর ব্যক্তিগত জীবনে আমি নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছি। বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানিতে ভাইবা দিলেও আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এছাড়া দুইবার এস আই নিয়োগে ভাইবা দেওয়ার পর এবং তিনবার ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হওয়ার পরও শেষ মুহূর্তে আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এভাবে কতগুলো পরীক্ষায় শেষ সময়ে বাতিল হয়েছি, তা মনে রাখতেও পারছি না।”

তারেক রহমান আরও বলেন, “কৃষি ব্যাংকের লিখিত পরীক্ষায় জালিয়াতি রোধ করতে গিয়ে আমি মারাত্মক হামলার শিকার হয়েছিলাম। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি বন্ধ করতে গিয়ে দুই ঘন্টা পুরোপুরি আটকানো হয়েছিল এবং ব্যাংকের নিরাপত্তা বিভাগের কর্মকর্তাদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। এই পরিস্থিতিতেই আমাকে বাধ্য হয়ে এসব পরীক্ষা পুনরায় দিতে হয়েছে।”

তারেকের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে ব্যক্তিগত সংগ্রাম ও ন্যায্যতার দাবিই তার প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল, যেখানে তিনি নিজেই নানা প্রতিবন্ধকতা ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছেন।

তারেক রহমানবলেন, “একটিভিজমের মধ্যে এতটাই ব্যস্ত হয়ে গেলাম যে চাকরিতে প্রবেশের সুযোগই পাইনি। ক্ষুধা ও দারিদ্র থেকে মুক্তি পেতে তখনই শুরু করি আম ব্যবসা। পেটের ক্ষুধা কীভাবে কষ্ট দেয়, সেটা আমরা বারবার টের পেয়েছি। বিভিন্ন খরচ-কুটার ব্যবসা আঁকড়ে ধরেছি, কিন্তু স্বাভাবিকভাবে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি।”

তিনি আরও স্মরণ করান, “পলাশীতে আমার একটি দোকান ছিল, যা দু’বার ভাংচুর করা হয়েছিল। এরপর আগারগাঁও পাকা মার্কেটে দীর্ঘদিন ব্যবসা করেছি। এমনকি প্রশাসনের লোক দিয়ে আমার কিছু দোনাক পর্যন্ত মাটির সাথে মিশিয়ে ফেলা হয়েছিল। এই সব প্রতিকূলতার কারণে অনলাইনে আম বিক্রি আমার ভার্চুয়াল ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়।”

তারেক রহমান বলেন, “আম ব্যবসার সঙ্গে মধু যোগ করলে তা আরও লাভজনক ও স্বাদোজ্জ্বল হয়। গ্রীষ্মে আম, শীতে মধু—এই মিলনে গড়ে ওঠে আমার ‘আম-মধুর ব্যবসা’। এই ব্যবসার মাধ্যমে পেশাগত স্বাবলম্বিতা অর্জন করেছি এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতাও পেয়েছি।”

তারেক রহমানআরও বলেন, “আমার জীবনে কোনো কিছুর জন্য আক্ষেপ নেই। হাজার ৪০ টাকার বেতন পেলে কেমন করে জীবন চলত, তা ভাবলেই দেখা যায়। আলহামদুলিল্লাহ, ‘আম-মধুর ব্যবসা’ কেবল পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করছে না, বরং রাজনীতিতেও এর ব্যয়ভার বহন হচ্ছে।”

তিনি আরো জানান, “২ দিন আগে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম, কিন্তু কোনোরকম কষ্ট বা ক্ষতি আমার বা পরিবারের জন্য হয়নি। আল্লাহ আমাকে হয়তো ঐ দায়িত্বের জন্য যোগ্য মনে করেননি। নেতৃত্ব আসলে আল্লাহর হাতে, ২০১৮ সাল থেকে wherever আল্লাহ আমাকে উপযুক্ত মনে করেছেন, আমি নেতৃত্ব দিয়েছি। হয়তো সংসদে আমার থাকার প্রয়োজন হয়নি, তাই সেদিকে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে আমি আমার এই জীবনটাই উপভোগ করি এবং আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ ভরসা রাখি।”

তারেক রহমানের এই বক্তব্যে উঠে আসে আত্মনির্ভরতা, বাস্তবতা ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের মিশ্রণ, যেখানে ব্যবসা, রাজনীতি ও জীবনধারার সঙ্গে আল্লাহর পরিকল্পনা ও সন্তুষ্টি নিয়ে গভীর চিন্তা প্রতিফলিত হয়েছে।

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়