বিএনপি থেকে যেসব নতুন মুখ সম্ভাব্য মন্ত্রিসভায়

গাজীপুর নিউজ ২৪|| প্রকাশিত: ০৮:৫১ এম, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬  
বিএনপি থেকে যেসব নতুন মুখ সম্ভাব্য মন্ত্রিসভায়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছেবাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পাওয়া এই বিজয় দলটির জন্য যেমন বড় অর্জন, তেমনি সমর্থকদের জন্যও এটি প্রত্যাশা পূরণের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। নির্বাচনে সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর এখন দলটি ব্যস্ত নতুন সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতিতে।

আগামীকাল মঙ্গলবার নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ উপলক্ষে রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত জোর আলোচনা চলছে—কেমন হতে যাচ্ছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা, কারা পাচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব, আর সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারই বা কী হবে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিজ্ঞ ও তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মন্ত্রিসভা গঠনের দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে অর্থনীতি পুনর্গঠন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের স্থিতিশীলতা এবং প্রশাসনিক সংস্কার—এসব বিষয়কে সামনে রেখেই মন্ত্রিসভা সাজানো হতে পারে। অর্থ, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার—এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে কে দায়িত্ব পাচ্ছেন, তা নিয়ে চলছে জোর জল্পনা-কল্পনা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি যদি দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সুশাসনের ভাবমূর্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করতে পারে, তবে তা সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইতিবাচক বার্তা দেবে। পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের রূপরেখা ঘোষণাও নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

দলের শীর্ষ পর্যায়ে একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে সম্ভাব্য মন্ত্রীদের নাম চূড়ান্ত করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে জোটসঙ্গী বা সমমনা রাজনৈতিক শক্তিকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে, সেটিও আলোচনায় রয়েছে। নারীদের অংশগ্রহণ, তরুণ নেতৃত্বের অন্তর্ভুক্তি এবং আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে বলে দলীয় ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি।

সব মিলিয়ে, আগামীকালকের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শুধু আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি হবে নতুন নীতি, নতুন অগ্রাধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের এক প্রতীকী সূচনা। এখন সবার নজর—বিএনপির প্রথম মন্ত্রিসভা কেমন চমক নিয়ে আসছে এবং সেই দল কত দ্রুত জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।

জানা গেছে, প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হতে যাওয়া তারেক রহমান তার মন্ত্রিসভা গঠনে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও নতুন নেতৃত্বের সমন্বয় রাখতে চান। সে লক্ষ্যেই পুরোনো নেতৃত্বের পাশাপাশি একাধিক নতুন মুখ অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজনের বিষয়ে ভাবছে দলটি।

দলীয় সূত্রে আরো জানায়, বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান নির্বাচনের পরের দিন থেকে প্রতিদিন গুলশান কার্যালয়ে বৈঠক করছেন। সম্ভাব্য মন্ত্রীদের তালিকা নিয়ে তার ঘনিষ্ঠ আর দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। একই সঙ্গে দেশের অভিজ্ঞ বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকেও পরামর্শ নিচ্ছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের মন্ত্রিসভা শুধু ক্ষমতার ভারসাম্য নয়, বরং প্রশাসনিক দক্ষতা ও জনমুখী ভাবমূর্তি—এ দুটি দিক বিবেচনায় রেখে সাজানো হচ্ছে। বিশেষ করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক সংস্কারকে সামনে রেখে দক্ষ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা ভাবছে বিএনপি।

দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র বলছে, অর্থ, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—এ ছয়টি মন্ত্রণালয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব মন্ত্রণালয়ে অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিদেরও দেখা যেতে পারে। নির্বাচনে ভালো করা কয়েকজন নতুন সংসদ সদস্য মন্ত্রিসভায় জায়গা পেতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।

একই সঙ্গে বিএনপির দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা নেতাদেরও মূল্যায়ন করা হবে। তবে বিতর্কিত বা জনসমালোচিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি এড়িয়ে একটি পরিষ্কার ভাবমূর্তির মন্ত্রিসভা গঠনের চেষ্টা থাকবে বলে দলীয় নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন।

দলটির একজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রধানমন্ত্রী একটি কার্যকর ও বার্তাবাহী মন্ত্রিসভা চান। শুধু রাজনৈতিক সমীকরণ নয়, কাজ করতে পারবেন—এমন মানুষদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

এদিকে রাজধানীসহ সারা দেশের রাজনৈতিক মহল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণের আলোচনায় এখন সম্ভাব্য মন্ত্রীদের নাম। কে পাচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—তা নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে শপথের দিনই। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণাÑনতুন সরকার শুরুতেই শক্ত বার্তা দিতে চাইবে। তাই মন্ত্রিসভা গঠনই হতে যাচ্ছে সরকারের প্রথম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরীক্ষা।

তরুণের মধ্যে আলোচনায়

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, ড. হুমায়ুন কবির (টেকনোক্র্যাটে), সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান, ড. মাহদী আমিন (টেকনোক্র্যাটে), ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার (টেকনোক্র্যাটে), সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম (টেকনোক্র্যাটে), প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম (টেকনোক্র্যাট), মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবীন (টেকনোক্র্যাট), ড. রেজা কিবরিয়া, সাঈদ আল নোমান, খন্দকার আবু আশফাকরা মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেতে পারেন।

সিনিয়রদের মধ্যে আলোচনায়

বিএনপির ২০০১-২০০৬ সরকারের সময়ের বেশ কয়েকজন মন্ত্রীকে এবারের মন্ত্রিপরিষদেও রাখার কথা ভাবছে দলটি। এছাড়া মাঠের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় একাধিক নেতাকে মন্ত্রিসভায় রাখার বিষয়ে আলোচনা চলছে। এদের মধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি অথবা উপরাষ্ট্রপতির মতো জায়গায় দেখা যেতে পারে।

মন্ত্রণালয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ড. এজেডএম জাহিদ হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু, শামসুজ্জামান দুদু, জয়নাল আবেদীন ফারুক, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আবুল খায়ের ভূঁইয়া, ইসমাঈল জবিউল্লাহ (টেকনোক্র্যাটে), মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও আ ন ম এহসানুল হক মিলন এবং দলটির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল (টেকনোক্র্যাট) ।

আন্দোলনের শরিকরা মন্ত্রিপরিষদে

কয়েক বছর আগে থেকেইবাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দাবিতে গড়ে ওঠা যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোকে নিয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়ে আসছিল। সেই ধারাবাহিকতার পরিপ্রেক্ষিতে এবার গঠিতব্য নতুন মন্ত্রিসভায় যুগপৎ আন্দোলনের একাধিক নেতার অন্তর্ভুক্তি থাকতে পারে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা রয়েছে।

দলটির নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজপথের আন্দোলন, কর্মসূচি ও রাজনৈতিক সংগ্রামে যারা একসঙ্গে ভূমিকা রেখেছেন, সরকার গঠনের প্রক্রিয়াতেও তাদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা হবে। তারা মনে করছেন, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল কাঠামোর মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন করা গেলে গণতন্ত্র পুনর্গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পথে কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব হবে।

এদিকে সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নামও আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে রয়েছেনজোনায়েদ সাকি, যিনিগণসংহতি আন্দোলন-এর আহ্বায়ক; ববি হাজ্জাজ, যিনিন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এনডিএম) ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন; আন্দালিব রহমান পার্থ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)-এর চেয়ারম্যান; নুরুল হক নুরু, গণঅধিকার পরিষদ-এর নেতা।

এছাড়া টেকনোক্র্যাট কোটায় সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তির তালিকায় রয়েছেন ১২ দলীয় জোটের প্রধান এবংজাতীয় পার্টি (জাফর)-এর চেয়ারম্যানমোস্তফা জামাল হায়দারএবং নাগরিক ঐক্যের সভাপতিমাহমুদুর রহমান মান্না

সব মিলিয়ে, নতুন সরকারে কারা জায়গা পাচ্ছেন এবং কী ধরনের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা হচ্ছে—তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের অন্তর্ভুক্তি শেষ পর্যন্ত কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই এখন মূল আলোচনার বিষয়।

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়