অন্তর্বর্তী সরকারে অধ্যাপক ইউনূস: অর্জন নাকি অপূর্ণতা?
২০২৪ সালেশেখ হাসিনাসরকারের পতনের পর গঠিতমুহাম্মদ ইউনূসনেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম, সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভিন্নমুখী আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই বলা হয়েছে, এ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল তিনটি—সংবিধানসহ নানা খাতে সংস্কার, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত কথিত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা এবং ঘোষিত রূপরেখা অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন।
সরকারের দাবি, বিচারিক প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে; বিভিন্ন খাতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়েছে এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে। সর্বশেষ ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নির্বাচনেবাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় হয়েছে বলেবাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনজানিয়েছে।
বিদায়ী ভাষণেমুহাম্মদ ইউনূসউল্লেখ করেন, “গত ১৮ মাস অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন শেষে আমরা একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করছি।”
নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এক চুক্তি ঘিরে নতুন করে আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তিটির বিষয়বস্তু প্রকাশ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার ঘোষিত তিনটি প্রধান এজেন্ডা বাস্তবায়নের পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফেরাতে সক্ষম হলেও, সরকারের ভেতরের একটি অংশের ভূমিকার কারণে সংস্কার কার্যক্রম আংশিকভাবে পথভ্রষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে—এটি প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচার, নাকি প্রতিশোধপরায়ণতার বহিঃপ্রকাশ—তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
তাদের দাবি, শুরু থেকেই ‘মব সংস্কৃতি’ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় এক ধরনের অনিয়ন্ত্রিত শক্তি প্রভাব বিস্তার করেছে এবং শেষ পর্যন্ত সরকার সেই চাপের মুখে নতি স্বীকার করেছে বলে ধারণা তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদেবপ্রিয় ভট্টাচার্যমনে করেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকার তুলনামূলকভাবে ভালো করলেও সামাজিক খাতে তারা প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক দিক থেকে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচনের দিকে এগোতে পারাটাকেও তিনি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখেন।
অন্যদিকেট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালকইফতেখারুজ্জামানবলেন, সংস্কার প্রক্রিয়ায় সরকার কিছু ক্ষেত্রে পথভ্রষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি বিচার কার্যক্রম নিয়েও ‘বিচার নাকি প্রতিশোধ’—এমন প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা সরকার চাইলে এড়িয়ে যেতে পারত বলে তিনি মনে করেন।
সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, " রাষ্ট্র সংস্কার ও দুর্নীতি প্রতিরোধে অ্যাডহক ভিত্তিতে কাজ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সুশাসনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি। বড় বড় চুক্তিগুলো এখনি কেন করতে হবে। শেষ পর্যায়ে বিদায়ী লিগ্যাসি হিসেবে কেন রেখে যেতে হবে। দলগুলোর সাথে আলোচনা হয়েছে কি-না পরিস্কার নয়। চুক্তির শর্তগুলো পরবর্তী সরকার ও জনগনের জন্য বোঝা হয়ে গেল কি-না এই প্রশ্ন আছে। সরকারের উচিত তারা কী কী রেখে যাচ্ছে সেই নোট প্রকাশ করা"।
প্রধান উপদেষ্টা তার বিদায়ী ভাষণে বলেছেন, "আমাদের প্রচেষ্টায় কোনো ঘাটতি ছিল না। আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনীতি ও প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে রেখেছি। আমরা ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, আর্থিক সংস্কারে হাত দিয়েছি—যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেকে স্থাপন করতে না পারে। আর সর্বোপরি, আমরা একটি উৎসবমুখর, অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ, পরিচ্ছন্ন ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেছি, যার মাধ্যমে জনগণ আবার তাদের ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে"।
যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মব সন্ত্রাস, যাদের হামলায় গত দেড় বছরে আক্রান্ত হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই সংবাদপত্র প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবন থেকে শুরু করে বহু মাজার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মারক।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০০৪ সালের ৮ই অগাস্ট ক্ষমতায় এসে মি. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার 'সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনকেই' তার সরকারের মূল এজেন্ডা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার চাপের মুখে প্রথমে প্রধান উপদেষ্টা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলেছিলেন।
পরে এক পর্যায়ে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সাথে আলোচনার পর সরকার ও বিএনপি যৌথভাবে ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগেই নির্বাচনের ঘোষণা দেয়।
শেষ পর্যন্ত ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ওসংস্কার প্রশ্নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে সরকার শুরুতেই রাষ্ট্রসংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক মোট ১১টি কমিশন গঠন করে এবং সেসব কমিশনের সুপারিশসহ রাষ্ট্রসংস্কারের জন্য দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়।
শেষ পর্যন্ত অন্তত ত্রিশটি বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর মধ্যে চারটি প্রশ্নে গণভোট হয়ে গেল ১২ই ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই। যদিও ঐকমত্য কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ডঃ ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, সংস্কার কমিশন ও জুলাই চার্টারের কৃতিত্ব সরকার নিতে পারে।
ছবির ক্যাপশান,'মানবতাবিরোধী অপরাধের' মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে "কিন্তু এটি পিক অ্যান্ড চুজ এবং এডহকিজমের শিকার হয়েছে। যে কারণে একদিকে শিক্ষাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংস্কার কমিশনই হয়নি, আবার যেসব বিষয়ে হয়েছে সেগুলোর অনেক কিছু সরকারের ভেতরেরই একটি অংশের কারণে পথভ্রষ্ট হয়েছে।
আসলে সংস্কারের যে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সেটি সরকারের বিবেচনাতেই ছিল না,' বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি। যদিও আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এর এক আলোচনায় বলেছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যতটা সংস্কার হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত কম সময়ে তেমনটি এর আগে আর হয়নি। তবে গণভোটে 'না' ভোট জয়ী হলে শেষ পর্যন্ত সরকারের সব সংস্কার উদ্যোগ ভেস্তে যায় কি-না তা নিয়েও অনেকের মধ্যে কৌতূহল আছে।
বিচারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী সংস্কারের পরেই গুরুত্ব পেয়েছে 'মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার'। ইতোমধ্যেই একটি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
এ মামলার অপর আসামি পুলিশের আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে ( রাজসাক্ষী) পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
গত বছরের ১৭ই নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করে।
এছাড়াও গত অক্টোবরে আইন মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, "জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্দেশে হত্যার অভিযোগে মোট ৮৩৭টি মামলা রেকর্ড হয়েছে"।
এর মধ্যে ৪৫টি মামলার বিচারকাজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে। এ ছাড়া তখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন ফৌজদারি আদালতে পুলিশ ১৯টি হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেছিল। এসব হত্যা মামলা বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে।
তবে সরকারের শুরু থেকেই ঢালাও হত্যা মামলা এবং এসব মামলায় শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে জড়িত করা নিয়ে সমালোচনা হয়ে আসছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, সাংবাদিকসহ অনেকের বিরুদ্ধে অনেক হত্যা মামলা হয়েছে যা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং প্রশ্নবিদ্ধভাবেও অনেককে আটক রাখা হয়েছে, যার স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।
"আবার যেসব মামলায় বিচার হচ্ছে, তাও কতটা প্রভাবহীন ও স্বচ্ছ- সেই প্রশ্নও আছে। তাই সত্যিকার অর্থেই বিচার নাকি প্রতিশোধ—সেই প্রশ্ন উঠবে। এটি সরকার চাইলে এড়াতে পারতো। ঢালাও মামলার কারণে সত্যিকার অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
বেহাল আইন শৃঙ্খলা ও মব
বাংলাদেশে গত দেড় বছরের বেশি সময়ে মানবাধিকার সংগঠক ও সংস্থাগুলোর কাছে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, কারা ও নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু, আর মব সন্ত্রাস। এই সময়কালে বারবার সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা আলোচনায় এসেছে।
এমনকি এবার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে বসত বাড়িতে আগুন, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ভালুকায় পিটিয়ে আগুন দিয়ে দিপু চন্দ্র হত্যা এবং পর পর কয়েকজন হিন্দু ব্যবসায়ী খুন হওয়ার ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে।
তবে সরকারের দিক থেকে সবসময়ই বলা হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের বাড়ি ঘরে হামলার বেশিরভাগ ঘটনা রাজনৈতিক কারণেই ঘটেছে, ধর্মীয় কারণে নয়।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর – অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ১৪ মাসে দেশে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এসেছে।
"সবদিক বিবেচনা করলে এ তিনটির মধ্যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সরকার অন্যগুলোর চেয়ে তুলনামূলক ভালো করেছেন। আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সফলতা হলো তার নির্বাচনের দিকে এগিয়েছে। কিন্তু সামাজিক ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ হয়েছে। একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী যেভাবে আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটাই দুশ্চিন্তার বিষয়," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
সামাজিক ক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ প্রকট হয়ে এসেছে ঢাকায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনার পর।
গত ১৮ই ডিসেম্বর রাতে কয়েক ঘণ্টা ধরে ওই হামলা চললেও সরকারের দিক থেকে কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, " এই মব কালচারের পেছনে থাকা অতি ক্ষমতায়িত শক্তিকে ম্যানেজ করতে সরকার ব্যর্থ হওয়ায় মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সরকারের ব্যর্থতায় এই শক্তি উৎসাহিত হয়েছে"।
এর আগে সরকারের শুরু থেকেই সারাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও সূফী-দরবেশ-বাউলদের মাজার আক্রান্ত হতে শুরু করে। পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের আক্রান্ত হবার ঘটনাও গত আঠারো মাসে বারবার আলোচনায় এসেছে।
এক বছর আগে ২০২৫ সালের শুরুতেই বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিলো, ২০২৪ সালের ৪ঠা অগাস্টের পর থেকে পরবর্তী ৫ মাসেই সারাদেশের ৪০টি মাজারে (মাজার/সুফি কবরস্থান, দরগা) ৪৪ বার হামলা চালানোর অভিযোগ পেয়েছিলো পুলিশ।
এরপরেও সেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। উল্টো নভেম্বরে মানিকগঞ্জে বাউল শিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে।
গত বছর মার্চে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই বলেছিলেন, "সম্প্রতি নারীদের ওপর যে জঘন্য হামলার খবর আসছে, তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। এটি 'নতুন বাংলাদেশ' এর যে স্বপ্ন আমরা দেখছি তার সম্পূর্ণ বিপরীত"।
কিন্তু তার পর থেকে সেই পরিস্থিতির আদৌ উত্তরণ হয়েছে কি-না, সেই প্রশ্ন আছে। "নারীর সমতার ক্ষেত্রে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কাই এসেছে এ সরকারের সময়ে। কারণ সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সরকারের ব্যর্থতায় মুক্তিযুদ্ধ, বাক স্বাধীনতা, নারীর সমতাসহ ৭১ ও ২৪ এর মৌলিক চেতনার বিষয়গুলোই ঝুঁকিতে পড়েছে। কারণ সরকার এসবের ওপর আঘাত প্রতিহত করার সৎ সাহস সরকার দেখাতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে যারা আঘাত করেছে সেই শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
সরকার কীভাবে দেখছে
প্রধান উপদেষ্টার দফতরের সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে যে ধারণা পাওয়া গেছে তাহলো- সংস্কার ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করাকে অন্তর্বর্তী সরকারের একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করে সরকার।
বিশেষ করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রে রূপান্তরের জন্য জুলাই ঘোষণাপত্র ও সনদ স্বাক্ষর এবং ২৫টির মতো ডান, বাম মধ্যপন্থী দলগুলোর মধ্যে অন্তত ৩০টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোকেই বড় অর্জন হিসেবে সরকারের লোকজন মনে করছে।
তাছাড়া সরকার মনে করে, সবকিছুতে সংস্কার বাস্তবায়ন না করা গেলেও কোন কোনো জায়গায় সংস্কার দরকারএবং সেখানে করনীয় কি সেটি সরকার চিহ্নিত করতে পেরেছে সংস্কার কমিশনগুলোর মাধ্যমে।
ইতোমধ্যেই সাংবিধানিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ হিসেবে আরপিওতে সংশোধনী আনা হয়েছে।
আর বিচারের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার একটি মামলার রায় ছাড়া গুম খুনের বিচার শুরু করাকে অর্জন হিসেবে দেখছে সরকার। কারণ সরকার বলছে, মামলাগুলোর তদন্তের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন ছাড়াও দ্রুত বিচারের জন্য যা যা করণীয় সেসব পদক্ষেপও যথাসময়ে সরকার নিতে পেরেছে।
এছাড়া গুম খুনের মামলায় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনাকেও সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক অর্জন বলে সরকারের দিক থেকে মনে করা হচ্ছে।
ক্ষমতায় আসার পরপরই আর্থিক খাতে সংস্কার এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। আওয়ামী লীগ আমলে হওয়া 'আর্থিক খাতের দুর্নীতি' নিয়ে একটি শ্বেতপত্রও প্রকাশ হয়েছে সরকারের উদ্যোগে।
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন সম্প্রতি বলেছেন, "উত্তরাধিকার সূত্রে একটি চ্যালেঞ্জিং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পাওয়ার পরও বাংলাদেশের অর্থনীতি সহনশীলতা দেখিয়েছে এবং ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে"।
রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
সরকারের দাবি অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলার যা আইএমএফ এর ঘোষিত পদ্ধতি অনুযায়ী এখন ২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
এছাড়া ব্যাংক খাতেও স্বস্তি ফিরে আসার দাবি করছে সরকার এবং এ খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে দুর্বল ৫টি ব্যাংককে একীভূত করা হয়েছে।
তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সফল হতে পারেনি। চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ডিসেম্বর মাসের মূল্যস্ফীতির যে চিত্র প্রকাশ করেছে, সে অনুযায়ী, ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর আগে নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।
গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। তবে এমন পরিস্থিতিতে সরকারের সাথে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে পারাটা তাদের জন্য একটি সাফল্য, বিশেষ করে গত বছর রোজায় দ্রব্যমূল্য খুব একটা বাড়েনি বলেই মনে করছেন তারা যদিও চালের দাম না কমার কারণে খাদ্যমূল্যস্ফীতি কমেনি বলে অর্থনীতিবিদরা বলছেন।
তবে সরকারের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ব্যর্থতা, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনা মোকাবেলায় ব্যর্থতার অভিযোগ সত্ত্বেও সরকার মনে করছে এর বেশিরভাগ ঘটনাই রাজনৈতিক।
সরকার বলেছে, এ সরকারের আমলে দুটি দুর্গাপূজায় অঘটন ঘটেনি। সরকারের দিক থেকে সাফল্য হিসেবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথাও বলা হচ্ছে। বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি হওয়ায় এখন বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি সুপ্রিম কোর্টই করবে।
অন্যদিকে আইন শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হলো 'অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করা ভয়াবহ চ্যালেঞ্জিং ছিলো। সে কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারতো কিন্তু সরকার পদক্ষেপ নেওয়ায় তা হয়নি'।
সরকার বলছে, জোরপূর্বক গুম, খুন বন্ধ হয়েছে এবং পুলিশ বাহিনীকে সক্ষম করে তোলা হয়েছে, যা ধীরে ধীরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে সরকার মনে করে।
তবে কারাগারে কিংবা হেফাজতে মৃত্যুর কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে সরকার বলছে, আগের মতো সরকার এগুলো প্রত্যাখ্যান করেনি, বরং তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
সরকারের শুরুর দিকে ১৬৭ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল। পরে সরকার নিজেই সেটি ভুল পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এখন সরকারের দিক থেকে বলা হচ্ছে যে, এই ঘটনা ছাড়া সরকারের পদক্ষেপের কারণে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা বিঘ্নিত হয়নি বরং প্রেস ফ্রিডমের উন্নতি হয়েছে।
যদিও বেশ কিছু সাংবাদিককে আটক, টকশোতে সরকারের সমালোচনার পর সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে গ্রেফতার এবং সর্বোপরি প্রথম আলো-ডেইলি স্টারে হামলার ঘটনাগুলোকে মত প্রকাশ কিংবা স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপরই হামলা হিসেবে বলছেন সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি ও বন্দর–বিতর্ক
বিদেশি বিনিয়োগ আনার লক্ষ্যে সরকার একাধিকবার চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নিলেও তা চূড়ান্ত করতে পারেনি। বিষয়টি ঘিরে দেশের ভেতরে ব্যাপক বিরোধিতা ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে, সরকারের সঙ্গেযুক্তরাষ্ট্র-এর একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির মাধ্যমে দেশের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হয়েছে—তা নিয়ে তখনই প্রশ্ন তোলেন সমালোচকেরা।
সমালোচনার মুখে নির্বাচনের তিন দিন পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রায় নয় মাসের দরকষাকষির পর বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পারস্পরিক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে।
তবে এই শুল্কহ্রাসের বিনিময়ে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল অঙ্কের ব্যয়ে উড়োজাহাজসহ বিভিন্ন পণ্য কিনতে হবে বলে জানা যায়। একই সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে পাঁচ বছরে ৩৫ লাখ টন গম আমদানির চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, চুক্তির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতে বিশেষ সুবিধা। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার, যেখানে মোট রপ্তানির বড় অংশই তৈরি পোশাক নির্ভর। নতুন ব্যবস্থায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।
এর আগে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত বিভিন্ন ইস্যুতে একাধিক দেশের সঙ্গে চুক্তি সই করে সরকার। এসবের মধ্যে রয়েছেচীন-এর সঙ্গে জিটুজি চুক্তিতে ড্রোন কারখানা স্থাপন, পাকিস্তানথেকে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান ক্রয়, চীন থেকে জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান সংগ্রহ, ইউরোপীয় কনসোর্টিয়ামের কাছ থেকে ইউরোফাইটার টাইফুন ক্রয়, দক্ষিণ কোরিয়াথেকে সাবমেরিন, তুরস্কথেকে টি-১২৯ অ্যাটাক হেলিকপ্টার এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্ল্যাক হক মাল্টিরোল হেলিকপ্টার কেনা।
সমালোচকদের অভিযোগ, এসব চুক্তির অনেকগুলোর শর্ত জনসমক্ষে পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি এবং অংশীজনদের সবার সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।



















