প্রশাসনে বড় রদবদল: পদপ্রার্থীদের তৎপরতা বেড়েছে

গাজীপুর নিউজ ২৪|| প্রকাশিত: ১০:৩৮ এম, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬  
প্রশাসনে বড় রদবদল: পদপ্রার্থীদের তৎপরতা বেড়েছে

সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকার গঠনের ঠিক আগের তিন দিনের মধ্যে জনপ্রশাসনের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ পদে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এই সময়ের মধ্যে সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোর দুই শীর্ষ কর্মকর্তা স্বেচ্ছায় নিজ দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের একজন হলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ এবং অন্যজন প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া।রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মন্ত্রণালয়সমূহের সমন্বয়, নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে সহায়তা এবং প্রশাসনিক তদারকির দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও নীতিগত সমন্বয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ফলে একই সময়ে এই দুটি পদের পরিবর্তন প্রশাসনিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এদিকে গতকাল সোমবার চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনিকে নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁর এই নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রেক্ষাপটে তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সব মিলিয়ে নতুন সরকার গঠনের প্রাক্কালে জনপ্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে এই পরিবর্তনগুলো প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলে এ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে এবং নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে প্রশাসনিক কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করা হচ্ছে।


জনপ্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনে আরও ব্যাপক ও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে পারে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে উচ্চপর্যায়ে একাধিক রদবদল ঘটতে পারে।

বিশেষ করে সচিব পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে থাকা কয়েকজন সচিবের পরিবর্তে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রে আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে মাঠ প্রশাসনেও প্রভাব পড়তে পারে। জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদসহ গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্রশাসনিক পদগুলোতেও রদবদল হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা বেশ কিছু কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি করা হতে পারে—এমন ধারণাও প্রশাসনের ভেতরে জোরালো হচ্ছে। নীতিনির্ধারণী স্তরে সমন্বয় জোরদার, কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই পরিবর্তন আনা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


ইতিমধ্যে সম্ভাব্য রদবদলকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের ভেতরে নানামুখী তৎপরতা শুরু হয়েছে। কিছু কর্মকর্তা সম্ভাব্য বদলির বিষয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে খোঁজখবর নিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ নতুন কর্মস্থলের প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেছেন। ফলে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই প্রশাসনিক অঙ্গনে পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে গেছে।


অন্যদিকে পুলিশ বিভাগসহ অন্যান্য সরকারি দপ্তর ও সংস্থাগুলোতেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে রদবদলের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তার প্রভাব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-দপ্তরেও পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। কে কোন পদে যেতে পারেন, কার বদলি হতে পারে—এসব নিয়ে ভেতরে ভেতরে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। এমনকি কেউ কেউ সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাওয়ার আশায় তৎপরতাও শুরু করেছেন।


সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে প্রশাসনে কিছু পরিবর্তন আনা স্বাভাবিক ও প্রচলিত প্রক্রিয়ার অংশ। নতুন নীতিগত অগ্রাধিকার, কর্মপরিকল্পনা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য সরকার সাধারণত প্রশাসনিক কাঠামোয় নিজেদের আস্থাভাজন ও দক্ষ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিয়ে থাকে।


তবে তাঁরা আশা প্রকাশ করেছেন, নতুন সরকার অতীতের মতো দলীয়করণে না গিয়ে মেধা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বকে প্রাধান্য দেবে। তাঁদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রশাসনে অতিরিক্ত দলীয় প্রভাব ও অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ নিয়ে যে সমালোচনা তৈরি হয়েছিল, নতুন সরকার সেই পথ অনুসরণ করবে না—এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্ট মহলের।


বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং নীতি-কার্যক্রম দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে জনপ্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে যোগ্য, অভিজ্ঞ ও নীতিনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা গেলে নতুন সরকারের কার্যক্রমে গতি আসবে এবং জনআস্থাও বৃদ্ধি পাবে।


বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)এর নির্বাচনী ইশতেহারেও প্রশাসনিক সংস্কার ও মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষেত্রে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিশেষ করে বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতাই হবে একমাত্র বিবেচ্য মানদণ্ড।


ইশতেহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কোনো ধরনের পক্ষপাত, রাজনৈতিক প্রভাব বা অযৌক্তিক বিবেচনা স্থান পাবে না। যাতে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার কথাও সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। অর্থাৎ পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে।


বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলে প্রশাসনের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা আরও শক্তিশালী হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে যে ‘দলীয়করণ’ ও যোগ্যতার পরিবর্তে প্রভাব-প্রতিপত্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব অঙ্গীকার কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেটিই এখন প্রধান প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিচ্ছে।


গত শনিবারপ্রথম আলো-তে প্রকাশিত এক অভিমত নিবন্ধেসেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলোরওনক জাহাননতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশার বিষয়টি তুলে ধরেন। সেখানে তিনি বিশেষভাবে প্রশাসনে দলীয়করণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।


রওনক জাহান বলেন, প্রশাসনে দলীয়করণ বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। তাঁর মতে, অতীতে যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে, তখনই প্রশাসন, পুলিশ, রাষ্ট্রায়ত্ত ও সরকারি সংস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজেদের অনুগত ব্যক্তিদের বসানোর প্রবণতা দেখা গেছে। এই সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।


তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাধারণ মানুষ এখন আর এ ধরনের চর্চা দেখতে চায় না। নাগরিকদের প্রত্যাশা হলো—রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততাই যেন অগ্রাধিকার পায়; রাজনৈতিক আনুগত্য নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে দলীয় প্রভাবমুক্ত, পেশাদার ও নীতিনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করা জরুরি।


বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা—তারা কি অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে সরে এসে প্রশাসনে নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, নাকি আগের ধারাই বহাল থাকবে। জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।


২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানেবাংলাদেশ আওয়ামী লীগএর নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর একই বছরের ৮ আগস্টমুহাম্মদ ইউনূসএর নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল শুরু হয়, যা ছিল সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস।


সরকার গঠনের পর প্রথম ছয় মাসেই শীর্ষ ও উচ্চপদস্থ আমলাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এ সময় সিনিয়র সচিব ও সচিব পদমর্যাদার ১৪ জন কর্মকর্তা, গ্রেড-১ পদের ১ জন এবং অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের ১৯ জন কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়।


একই সময়ে আরও বড় একটি অংশকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। সিনিয়র সচিব ও সচিব পর্যায়ের ২৩ জন, গ্রেড-১ পদের ২ জন এবং অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের ৫১ জন কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়। পরবর্তী সময়েও আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে একইভাবে ওএসডি করা হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়।


পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ব্যাপক প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রে নিজেদের নীতিগত অগ্রাধিকার প্রতিফলিত করার চেষ্টা করেছে। তবে এত সংখ্যক কর্মকর্তাকে একযোগে অবসর বা ওএসডি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা-সমালোচনাও তৈরি হয়। অনেকেই এটিকে প্রয়োজনীয় পুনর্গঠন হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ কেউ প্রশাসনের ধারাবাহিকতা ও অভিজ্ঞতার ক্ষতির আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেছেন।


অন্যদিকে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে, বিশেষ করে সচিব ও সমমর্যাদার একাধিক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে সচিব ও সমপর্যায়ের পদে অন্তত ১৬ জন কর্মকর্তা চুক্তিতে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে এসব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।


এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০৯টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছেবাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে প্রায় দুই দশক পর দলটি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে। আজ মঙ্গলবার নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ এবং নতুন মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হবে।

রাজনৈতিক এই পালাবদলের প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়েও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। এরই মধ্যে শনিবার দুই বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা সংশোধিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়েছে।


সব মিলিয়ে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রাক্কালে প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, সম্ভাব্য বদলি এবং নীতিগত পুনর্বিন্যাস নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, শিগগিরই আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসতে পারে, যা নতুন সরকারের প্রশাসনিক অগ্রাধিকার প্রতিফলিত করবে।


যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিগত সময়ে যেসব কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছিলেন, তাঁদের পদায়ন ও পদোন্নতির জন্য জনপ্রশাসন সচিবকে অনুরোধ করেছেন তাঁরা। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মকর্তাদের পদায়নের সময় যেন সৎ, যোগ্যতা ও দক্ষতা দেখা হয়।

শেখ আবদুর রশীদের চুক্তি বাতিলের দিনই মন্ত্রিপরিষদ সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়াকে। তবে প্রশাসনিক এই অস্থায়ী ব্যবস্থাপনা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। গতকাল এম সিরাজ উদ্দিন মিয়াও চাকরি থেকে পদত্যাগের আবেদন করেন। পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁর চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়।


এর পরপরই প্রশাসনের শীর্ষ পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এই সময়কালে দায়িত্ব নেওয়াকে তিনি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছেন। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, প্রশাসনের প্রতিটি দায়িত্বই গুরুত্বপূর্ণ এবং চ্যালেঞ্জপূর্ণ।


এ সময় তিনি নতুন মন্ত্রিসভার শপথ আয়োজনের প্রস্তুতির বিষয়েও কথা বলেন। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে শপথ অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।


সব মিলিয়ে নতুন সরকারের যাত্রা শুরুর প্রাক্কালে জনপ্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে দ্রুত পরিবর্তন ঘটেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ধারাবাহিক পরিবর্তন নতুন সরকারের প্রশাসনিক অগ্রাধিকার ও নীতিগত অবস্থানের একটি বার্তাও বহন করছে।


এদিকে প্রশাসনের পাশাপাশি আইন অঙ্গনেও নতুন নিয়োগের ঘোষণা এসেছে। গতকালসুপ্রিম কোর্টএর পাঁচজন আইনজীবীকে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়।


নতুন নিয়োগ পাওয়া পাঁচ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হলেন মো. আবদুস সামাদ, মলয় কুমার রায়, মো. শফিকুল ইসলাম, মো. ইছা এবং মো. ওবায়দুর রহমান (তারেক)। তাঁদের মধ্যে মো. ইছা ও মো. ওবায়দুর রহমান ইতিপূর্বে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় তাঁদের পদোন্নতির মাধ্যমে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে ধারণা করা হচ্ছে।


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে বর্তমানে ৯৮ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কর্মরত রয়েছেন। নতুন পাঁচজন যোগ দেওয়ায় এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১০৩ জনে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পালাবদলের প্রেক্ষাপটে আইন কর্মকর্তাদের এই নিয়োগকেও তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মামলা ও আইনি কার্যক্রমে সরকারের অবস্থান উপস্থাপনে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; ফলে এ পদে নিয়োগ সবসময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।


নবগঠিত সরকার ক্ষমতায় এলে প্রশাসনে কিছু রদবদল হওয়া অস্বাভাবিক নয়—বিশ্বের প্রায় সব গণতান্ত্রিক দেশেই নীতিগত অগ্রাধিকার, কর্মপরিকল্পনা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস করা হয়। নতুন সরকার সাধারণত এমন একটি টিম গড়ে তুলতে চায়, যারা তাদের লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে সক্ষম।


তবে রদবদলের এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যোগ্যতা ও পেশাদারিত্বের মানদণ্ড বজায় রাখা। নিয়োগ, বদলি কিংবা পদোন্নতির ক্ষেত্রে যদি মেধা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সততা ও প্রশাসনিক সক্ষমতাকে প্রাধান্য না দেওয়া হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রযন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। কেবল আনুগত্য বা রাজনৈতিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিলে প্রশাসনের ভেতরে হতাশা, অনিশ্চয়তা ও আস্থাহীনতা তৈরি হতে পারে।

একটি সরকারের সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার বাস্তবায়নক্ষমতার ওপর। আর সেই বাস্তবায়নক্ষমতা গড়ে ওঠে দক্ষ ও প্রেরণাদীপ্ত কর্মীবাহিনীর মাধ্যমে। নীতিনির্ধারণ যত ভালোই হোক, সেটি কার্যকর করতে না পারলে প্রত্যাশিত ফল আসে না। ফলে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে সৎ, যোগ্য ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া নতুন সরকারের জন্য কৌশলগত প্রয়োজন।


সবশেষে বলা যায়, প্রশাসনে পরিবর্তন স্বাভাবিক; কিন্তু সেই পরিবর্তন যদি ন্যায়, স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়, তাহলে তা সরকারের স্থিতিশীলতা ও জনআস্থা—উভয়ই শক্তিশালী করে। অন্যথায় নতুন সরকার নিজের লক্ষ্য পূরণে কার্যকর ও নিবেদিত কর্মীবাহিনী গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।


এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে রাজনৈতিক ও পেশাদার প্রচেষ্টা একসাথে দেখা যাচ্ছে।এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার, বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর, নতুন সরকার আসার প্রাক্কালে পদ পেতে তৎপরতার মধ্যে রয়েছেন। এ ধরনের তৎপরতা সচিবালয়ে বিএনপিপন্থী অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাঁদের পক্ষ থেকে সচিবসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের দাবির সঙ্গে একধরনের চাপও তৈরি হচ্ছে।


নির্বাচনের পর প্রথম কর্মদিবস রোববার, প্রশাসন ক্যাডারের সংগঠনবাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনএর কয়েকজন নেতা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তারা ‘বঞ্চিত কর্মকর্তাদের’ পদায়ন ও পদোন্নতির বিষয়টি নিয়ে দাবি জানিয়েছেন।


সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও অতিরিক্ত সচিব বাবুল মিঞা প্রথম আলোকে বলেছেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অতীত সময়ে যেসব কর্মকর্তারা বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের যথাযোগ্য পদায়ন ও পদোন্নতির ব্যবস্থা করা উচিত। তিনি আরও যোগ করেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে অবশ্যই সৎ, যোগ্যতা এবং দক্ষতা প্রাধান্য পেতে হবে। এই দাবি নতুন সরকারের প্রশাসনিক সংস্কারে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকেই তুলে ধরে।


প্রশাসনে রদবদল নতুন কোনো ঘটনা নয়—বিশ্বের প্রায় সব দেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে প্রশাসনের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আনা হয়। তবে এর সঙ্গে একাধিক জটিল বিষয় জড়িত। জনপ্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিকভাবে গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং অন্যান্য তথ্য ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সরকারগুলো প্রায়ই নিজেদের অনুগত কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করেন, যা কখনও কখনও প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বে প্রভাব ফেলে।


এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার, বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর ও সাবেক সচিব, প্রথম আলোকে বলেন, নতুন সরকার আসার পর প্রশাসনে রদবদল স্বাভাবিক, সারা বিশ্বেই এমন ঘটনা ঘটে। তবে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা, দক্ষতা, সততা ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় থাকা অত্যন্ত জরুরি। নইলে নতুন সরকার কার্যকরভাবে কাজ করার জন্য যোগ্য কর্মী বাহিনী পাবে না।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, নতুন সরকারকে অবশ্যই পেশাদার ও নীতিনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করতে হবে। পেশাদার কর্মকর্তা দলের প্রতি অনুগত নয়, বরং সরকারের প্রতি অনুগত থাকেন এবং দেশের সর্বোচ্চ স্বার্থ ও প্রশাসনিক নীতি অনুযায়ী কাজ করেন। এ ধরনের কর্মকর্তাদের নিয়োগ নিশ্চিত করলে সরকার তার নীতিমালা বাস্তবায়নে সফল হতে পারে এবং প্রশাসনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়।


সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়