যমুনা রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা হবে নতুন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন
দেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য এই মুহূর্তে কোনো নির্ধারিত স্থায়ী সরকারি বাসভবন প্রস্তুত নেই। ঐতিহাসিক ‘গণভবন’কে পুনর্বিন্যাস করে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার পর নতুন প্রধানমন্ত্রীর আবাসন নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে দায়িত্ব গ্রহণের প্রাক্কালে বিষয়টি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পরিণত হয়েছে।
আগামী মঙ্গলবার শপথ নিতে যাচ্ছেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু কোথায় স্থাপিত হবে এবং নতুন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন কোন স্থানে নির্ধারণ করা হবে—তা নিয়ে সবার দৃষ্টি এখন সেদিকেই। নিরাপত্তা, প্রশাসনিক কার্যক্রম, কূটনৈতিক সাক্ষাৎ এবং আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য উপযুক্ত অবকাঠামো দ্রুত প্রস্তুত করা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, শপথ নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবেতারেক রহমানকোথায় অবস্থান করবেন। তিনি কি অস্থায়ী কোনো সরকারি বাসভবনে উঠবেন, নাকি নতুনভাবে নির্ধারিত কোনো স্থাপনাকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বাসভবন হিসেবে গড়ে তোলা হবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সরকারি-বেসরকারি মহলে এ নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা ও আলোচনা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত অস্থায়ী ব্যবস্থার মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর আগেই প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ইস্যু রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান প্রধান উপদেষ্টামুহাম্মদ ইউনূসদায়িত্ব ছাড়ার পর রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা ‘যমুনা’কেই প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সেটি বাস্তবায়ন করতে কিছুটা সময় লাগবে বলেই সংশ্লিষ্ট মহল জানিয়েছে।
সূত্র বলছে, দায়িত্ব ছাড়ার পরপরই ‘যমুনা’ পুরোপুরি খালি হয়ে যাচ্ছে না। ড. ইউনূস কবে আনুষ্ঠানিকভাবে বাসভবনটি ছাড়বেন, তা এখনো চূড়ান্ত নয়। এমনকি তিনি স্থানত্যাগের পরও ভবনটিকে নতুন প্রধানমন্ত্রীর উপযোগী করে তুলতে ব্যাপক সংস্কার ও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সংযোজন করতে হবে। নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়ন, দাপ্তরিক কক্ষ পুনর্বিন্যাস এবং আবাসিক অংশ আধুনিকায়ন—সব মিলিয়ে অন্তত দুই মাস সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে রাজধানীর সরকারি আবাসন কাঠামোর মধ্যে বিকল্প ব্যবস্থাও রয়েছে।মিন্টো রোড-এ বিরোধীদলীয় নেতার জন্য নির্ধারিত ২৯ নম্বর বাড়ি রয়েছে। পাশাপাশিহেয়ার রোডওবেইলি রোড-এ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের জন্য মোট ১৫টি বাংলো ও অ্যাপার্টমেন্ট বরাদ্দ আছে।
এ ছাড়া বেইলি রোডে তিনটি ‘মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট’ ভবনে প্রায় ৩০ জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর আবাসনের উপযোগী বৃহৎ ফ্ল্যাটের ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর আবাসন চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে এসব স্থাপনার কোনোটি ব্যবহার করা হতে পারে কিনা, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
সব মিলিয়ে, নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রীর আবাসন নির্ধারণ এখন প্রশাসনিক প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
আরেকটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, পারিবারিক আবেগ ও ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা বিবেচনায় রেখে প্রধানমন্ত্রী হিসেবেতারেক রহমানঐতিহ্যবাহী ‘ফিরোজা’ ভবনেই সাময়িকভাবে অবস্থান করতে পারেন। তাঁর মায়ের স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িটি রাজনৈতিকভাবেও প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে, ফলে সিদ্ধান্তটি কেবল আবাসিক নয়—এক ধরনের বার্তাও বহন করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে আরেকটি মত বলছে, গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাড়িটিও তাঁর সম্ভাব্য ঠিকানা হতে পারে। লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর পরিবার-পরিজন নিয়ে বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন তিনি। সেই আবাসন থেকেই প্রাথমিকভাবে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার কথাও শোনা যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, স্থায়ী সরকারি বাসভবন চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি সেখান থেকেইপ্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, তেজগাঁও-এ গিয়ে নিয়মিত প্রশাসনিক কাজ করবেন। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট বাড়ি এবং আশপাশের পুরো এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে, যাতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অনুযায়ী প্রটোকল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
সব মিলিয়ে, নতুন প্রধানমন্ত্রীর আবাসন নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না এলেও সম্ভাব্য একাধিক বিকল্প সামনে রেখে প্রশাসনিক প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত বাসভবন মানেই শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক আবাসন নয়; এর সঙ্গে জড়িত থাকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামো। একজন প্রধানমন্ত্রী যেখানে অবস্থান করেন, সেখানে তাঁর দপ্তর-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যক্তিগত স্টাফ, নিরাপত্তা বাহিনী এবং প্রটোকল টিমের জন্যও উপযুক্ত অবকাঠামো থাকতে হয়।
এই বিবেচনায় গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাড়িটি প্রধানমন্ত্রীর অস্থায়ী ব্যক্তিগত আবাস হিসেবে ব্যবহারযোগ্য হলেও, পূর্ণাঙ্গ সরকারি বাসভবনের মানদণ্ড পূরণ করে না—এমন মত সংশ্লিষ্ট মহলের। কারণ সেখানে আলাদা দপ্তর কক্ষ, কন্ট্রোল রুম, নিরাপত্তা ব্যারাক, প্রটোকল জোন, গণমাধ্যম ব্রিফিং স্পেস কিংবা ভিভিআইপি অতিথি গ্রহণের জন্য নির্ধারিত অবকাঠামো নেই।
প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন সাধারণত একাধিক স্তরের নিরাপত্তা বলয়, পর্যাপ্ত পার্কিং, প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার কক্ষ, স্টাফ কোয়ার্টার এবং সহায়ক সুবিধা নিয়ে গড়ে তোলা হয়। ফলে স্থায়ী বা আধা-স্থায়ী আবাসন নির্ধারণের ক্ষেত্রে এসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ কারণে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিকল্প স্থানসমূহের কাঠামোগত সক্ষমতা, নিরাপত্তা চাহিদা এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতা—সব দিক বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। স্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত অবকাঠামো নিশ্চিত করাই হবে সরকারের অগ্রাধিকার।
প্রথমদিকেজাতীয় সংসদ ভবনএলাকার ভেতরে অবস্থিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের সরকারি বাসভবন একীভূত করে সেখানে প্রধানমন্ত্রীর আবাস গড়ে তোলার প্রস্তাব ওঠে। কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনায় তা সম্ভব হয়নি। কারণ এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান আবাসন ভেঙে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন হতো, ফলে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বিকল্প আবাসনের প্রশ্নও সামনে আসে।
এ ছাড়া সংসদ ভবন কমপ্লেক্সটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতিলুই আই ক্যান-এর নকশায় নির্মিত। তাঁর স্থাপত্য পরিকল্পনার স্বকীয়তা ও সংরক্ষণ নিয়ে আগেই বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। ফলে মূল নকশার সামঞ্জস্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও সমালোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পরবর্তী সময়েশেরেবাংলা নগর-এর পরিত্যক্ত বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নির্মাণের বিষয়টিও বিবেচনায় আনে ইউনূস সরকার। ওই স্থান থেকে জাতীয় সংসদ ভবন ও তেজগাঁওয়ে অবস্থিতপ্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়-এ যাতায়াত অপেক্ষাকৃত স্বল্প দূরত্বের মধ্যে হওয়ায় পুরো রুটটি নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় রাখা সহজ হতো—এমন যুক্তিও ছিল আলোচনায়।
তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে নিয়মিত রাস্তাবন্ধ, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও সম্ভাব্য জনদুর্ভোগের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সেই পরিকল্পনাও শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হয়। ফলে এখনো পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর স্থায়ী সরকারি বাসভবন চূড়ান্ত না হওয়ায় বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে খোলামেলা আলোচনার মধ্যেই রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীখালেকুজ্জামান চৌধুরীবলেন, বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা যে রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা ‘যমুনা’-তে অবস্থান করছেন, আপাতত সেটিই প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।
তিনি আরও বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজেই কোন বাসভবনকে তাঁর জন্য উপযুক্ত মনে করেন, সেটিই নির্ধারক হতে পারে। অর্থাৎ প্রশাসনিক প্রস্তুতি থাকলেও রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিবেচনাই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এ বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি এখনো নীতিগত সিদ্ধান্তের পর্যায়ে রয়েছে এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর স্থায়ী আবাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।



















