ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন আন্তর্জাতিক মানের
কুটনৈতিক সংবাদদাতা:
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মূল্যায়নে জানিয়েছে, এটি আন্তর্জাতিক মানের এবং প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে তারা উল্লেখ করেছে, নির্বাচনে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ আশাব্যঞ্জক নয়। অন্যদিকে, কমনওয়েলথের পর্যবেক্ষক দল বলেছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের বিরুদ্ধে নির্বাচনের সময় কোনো বিশেষ হামলা বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি।
শুক্রবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে সংবাদ সম্মেলনে ইইউ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস বলেন, “নির্বাচন স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে পরিচালিত হয়েছে। এটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।” তিনি আরও জানান, ২০০৮ সালের পর এটি প্রথমবারের মতো প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন, যা নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইজাবস বলেন, নির্বাচনের সময় কিছু স্থানীয় রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটলেও তা প্রায়শই অনলাইনে গঠিত ভুল বা প্রপাগান্ডা দ্বারা উসকে দেওয়া হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছভাবে কাজ করে স্টেকহোল্ডারদের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে। মিশনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, নির্বাচনী আইনি কাঠামো যথেষ্ট হলেও আরও সংস্কার প্রয়োজন, যা জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে উল্লেখ করেন, নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা অত্যন্ত কম ছিল। মোট প্রতিদ্বন্দ্বীর মাত্র ৪% নারী ছিলেন; বিএনপি থেকে ১০ জন, এনসিপি থেকে দুইজন প্রার্থী অংশ নিয়েছেন, আর জামায়াতে ইসলামীসহ ৩০টিরও বেশি দল কোনো নারী প্রার্থী দায়িত্ব নেননি। এছাড়া পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, বৈষম্য এবং ডিজিটাল ও শারীরিক হয়রানির মতো প্রতিবন্ধকতাগুলো নারীর অংশগ্রহণকে সীমিত করেছে।
ইজাবস আরও বলেন, আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা না থাকায় তাদের আশা অনেকাংশে পূর্ণ হয়নি। নির্বাচনের প্রথম সপ্তাহে কিছু রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটলেও তা স্থানীয় পর্যায়ে সীমিত ছিল, এবং সুনিয়ন্ত্রিত কোনো প্যাটার্ন দেখা যায়নি। ইইউ মিশন ৫৬টি সহিংসতার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছে, যার ফলে ২৭টি জেলায় কমপক্ষে ২০০ জন আহত হয়েছেন।
পর্যবেক্ষকরা প্রশংসা করেছেন, ভোটার শিক্ষা কার্যক্রমে যুব সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ভোটারদের বিস্তৃত রাজনৈতিক বিকল্প পাওয়ার সুযোগ। নির্বাচনী প্রস্তুতি পেশাদারিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে; বিদেশে প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার ভোটার ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন, এবং ৮ লাখ ৫০ হাজারের বেশি নির্বাচনকর্মী প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তবে অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র প্রতিবন্ধী ও সীমিত চলাচলক্ষম ভোটারের জন্য সহজলভ্য ছিল না।
কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দলের চেয়ার ও ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা আকুফো-আডো বলেন, “নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররা কোনও আক্রমণের মুখোমুখি হননি, যদিও কিছু অঞ্চলে ভোটারের উপস্থিতি কম ছিল।” তিনি নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নাগরিক অংশগ্রহণকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আকুফো-আডো আরও বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো বড় জালিয়াতি ধরা পড়েনি। নির্বাচনের সময় কিছু ছোটখাটো অনিয়ম থাকলেও আপিল ও অভিযোগ নিষ্পত্তি স্বচ্ছভাবে হয়েছে। তিনি জনগণ, নির্বাচন কর্মকর্তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও অন্তর্বর্তী সরকারসহ সব পক্ষকে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রশংসা করেছেন।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নতুন সংসদ ও সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক, এবং জনগণের স্বীকৃতির মাধ্যমে এটি আরও শক্তিশালী হয়েছে।



















