রমজান ২০২৬: কবে শুরু হবে এবং যা কিছু জানা দরকার

গাজীপুর নিউজ ২৪|| প্রকাশিত: ০৯:৩৯ এম, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬  
রমজান ২০২৬: কবে শুরু হবে এবং যা কিছু জানা দরকার

সৌদি আরব ও আরও কয়েকটি দেশ জানায় যে তারা চাঁদের ক্ষুদ্র বাঁকা অংশ (হিলাল) দেখতে পেয়েছে এবং ১৮ ফেব্রুয়ারিকে রমজানের প্রথম দিন ঘোষণা করেছে।

বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের জন্য পবিত্র রমজান মাস হলো আত্মিক চিন্তাভাবনা, অধিক ইবাদত, দান-সদকা ও সাম্প্রদায়িক বন্ধনের সময়।

ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকেন এবং নিজেদের ঈমানের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।

এখানে রমজান নিয়ে সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসিত কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।

রমজান কী এবং মুসলমানরা কেন রোজা রাখেন?

রমজান ইসলামি ক্যালেন্ডারের নবম মাস এবং মুসলমানদের কাছে অন্যতম পবিত্র মাস।

রোজা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি এবং ধর্মের মূলভিত্তির অংশ। অন্য স্তম্ভগুলো হলো: ঈমানের ঘোষণা (শাহাদাহ), নামাজ, দান (যাকাত) এবং হজ পালন।

মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, রোজার মাধ্যমে তারা আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে পারেন। এ সময় তারা নামাজ পড়া, কোরআন তিলাওয়াত এবং দান-সদকার মতো ইবাদতে সময় ব্যয় করেন।

দিনের বেলায় খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকা আত্মসংযম অনুশীলনের সুযোগ দেয় এবং ঈমানের ওপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে সহায়তা করে।

রোজা মানুষকে কম সৌভাগ্যবানদের কষ্ট অনুভব করতে এবং অভাবীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখায়।

ইচ্ছাকৃতভাবে খাওয়া-দাওয়া, দাম্পত্য সম্পর্ক বা ধূমপান করলে রোজা ভেঙে যায়। ঋতুস্রাবের সময় নারীরা রোজা রাখেন না।

রমজানে মুসলমানদের সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো (সেই বিখ্যাত বিস্ময়— “পানি-ও না?”)—ভুল করে খেলে বা পানি পান করলে কী হবে? কেউ না দেখলে কি গোপনে এক চুমুক নেওয়া যায়?

ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু খাওয়া বা পান করলে রোজা ভঙ্গ হয়, কারণ রমজানের উদ্দেশ্য হলো আত্মসংযম ও ইবাদতে মনোযোগ দেওয়া।

তবে প্রকৃত ভুলে খাওয়া বা পান করলে রোজা নষ্ট হয় না; সে ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে রোজা চালিয়ে যেতে পারেন।

প্রতি বছর রমজানের তারিখ কেন পরিবর্তিত হয়?

ইসলাম চন্দ্রপঞ্জিকা অনুসরণ করে। নতুন চাঁদের ক্ষুদ্র অংশ দেখা গেলে রমজান শুরু হয়।

চন্দ্রবর্ষ সৌরভিত্তিক ৩৬৫ দিনের গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের চেয়ে ১০–১১ দিন ছোট।

এই পার্থক্যের কারণে রমজান প্রতি বছর ভিন্ন তারিখে শুরু হয়।

মুসলিম-অধ্যুষিত দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় কমিটি চাঁদ দেখে আনুষ্ঠানিকভাবে রমজানের ঘোষণা দেয়।

অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে কেউ জাতীয় মসজিদ বা স্বীকৃত ইসলামি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করেন, আবার কেউ সৌদি আরব, পাকিস্তান বা ভারতের মতো দেশের ঘোষণার অনুসরণ করেন।

এ বছর কবে শুরু হবে?

সৌদি আরব, কাতার ও কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ জানায় তারা ১৭ ফেব্রুয়ারি চাঁদ দেখেছে এবং ১৮ ফেব্রুয়ারিকে রমজানের প্রথম দিন ঘোষণা করেছে।

অন্যদিকে মিসর, তুরস্ক, জর্ডানসহ কিছু দেশ জানায় চাঁদ দেখা যায়নি, তাই তারা বৃহস্পতিবার ১৯ ফেব্রুয়ারি রমজান শুরু হওয়ার ঘোষণা দেয়।

চন্দ্রমাস ২৯ বা ৩০ দিনের হওয়ায় রোজার মাস সম্ভবত শেষ হবে ১৮ মার্চ (বুধবার) বা ১৯ মার্চ (বৃহস্পতিবার)।

ফলে ঈদুল ফিতর সম্ভবত ১৯ মার্চ (বৃহস্পতিবার) বা ২০ মার্চ (শুক্রবার) হতে পারে।

ঈদুল ফিতর রমজানের সমাপ্তি ঘোষণা করে। মুসলমানরা সাধারণত ঈদের সকালে হালকা নাশতা করেন, ঈদের নামাজের আগে দান করেন এবং জামাতে নামাজ আদায় করেন।

এ বছর রোজা কত ঘণ্টা হবে?

প্রতিদিনের রোজার সময় স্থানভেদে ভিন্ন হয়, কারণ তা দিনের আলো কতক্ষণ থাকে তার ওপর নির্ভর করে। বছরের সময় অনুযায়ীও তা বদলায়।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক উত্তর নরওয়ে: যদি ডিসেম্বর মাসে রমজান পড়ে, তাহলে উত্তর মেরুর কাছাকাছি এলাকায় দিনের আলো কম থাকায় রোজার সময় ছোট হবে।

কিন্তু গ্রীষ্মকালে একই স্থানে প্রায় সারাদিনই আলো থাকে, ফলে রোজার সময় দীর্ঘ হবে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় মুসলমানরা নিকটবর্তী মুসলিম দেশের সময়সূচি বা সৌদি আরবের মক্কার সময় অনুসরণ করতে পারেন।

সাধারণত রোজার সময় ১১ ঘণ্টা থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে মুসলমানরা রমজানের শুরুতে প্রায় ১২ ঘণ্টা এবং শেষে প্রায় ১৪ ঘণ্টা রোজা রাখেন। কানাডার অটোয়ায় তা ১৪ ঘণ্টার বেশি, আর দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রায় ১২ ঘণ্টা হতে পারে।

মুসলমানরা রমজানের প্রস্তুতি কীভাবে নেন?

প্রতিটি পরিবার ভিন্নভাবে প্রস্তুতি নেয়। এটি পরিবার ও বন্ধুদের একত্রিত হওয়ার সময়।

অনেকে বাড়িতে ইফতারের আয়োজন করেন এবং বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানান। অনেক মসজিদ উন্মুক্ত ইফতারের আয়োজন করে।

রমজান শুরুর আগে অনেকে খারাপ অভ্যাস ত্যাগ করার চেষ্টা করেন, আত্মিক প্রস্তুতি নেন এবং বেশি দান-সদকায় অংশ নেন।

রমজানের একটি সাধারণ দিন কেমন?

রমজানে মুসলমানরা সূর্য ওঠার আগে সাহরি খান। তারপর সূর্যাস্ত পর্যন্ত কিছু খান বা পান করেন না। সূর্যাস্তের পর ইফতার করেন।

ইফতারের পর ঐচ্ছিক রাতের নামাজ তারাবিহ আদায় করা হয়, যা অনেক সময় গভীর রাত পর্যন্ত চলে।

সাধারণত মসজিদে জামাতে এই নামাজ আদায় করা হয়, তবে বাড়িতেও পড়া যায়।

রমজানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য

প্রতিদিনের রোজা সাধারণত খেজুর খেয়ে ভাঙা হয়, যা নবী মুহাম্মদের (সা.) সুন্নাহ।

এরপর মাগরিবের নামাজ পড়ে বসে খাবার খাওয়া হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের অনেক অঞ্চলে রমজান উপলক্ষে পাড়া-মহল্লা ফানুস ও ব্যানারে সাজানো হয়।

মিসর ও তুরস্কের মতো দেশে ‘মুসাহারাতি’ ড্রাম বাজিয়ে মানুষকে সাহরির জন্য জাগিয়ে তোলে।

রমজানে মুসলমানদের আর কী করণীয়?

রমজানজুড়ে দান-সদকায় অংশ নেওয়া প্রত্যাশিত। এর মধ্যে বাধ্যতামূলক যাকাতুল ফিতর রয়েছে, যা ঈদের নামাজের আগে প্রদান করা হয়।

এর উদ্দেশ্য হলো মাসজুড়ে কোনো ত্রুটির জন্য আত্মশুদ্ধি এবং অভাবীদের খাদ্যের ব্যবস্থা করা।

এটি সাধারণ যাকাত থেকে ভিন্ন, যা বছরের যেকোনো সময় দেওয়া যায় এবং যা মোট সঞ্চয়ের ২.৫ শতাংশ।

অনেক মধ্যপ্রাচ্যের দেশে রমজান জনপ্রিয় টিভি সিরিজের মৌসুম। তবে অনেকে বিনোদনের সময় কমিয়ে কোরআন অধ্যয়নে বেশি সময় দেন।

রমজানের শেষ ১০ দিন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বাস করা হয়, এই সময়েই কোরআনের প্রথম আয়াত নবী মুহাম্মদের (সা.) ওপর নাজিল হয়। এই রাতকে বলা হয় লাইলাতুল কদর (শবে কদর) — যার অর্থ ‘ফয়সালার রাত’ বা ‘মর্যাদার রাত’।

কোরআনে উল্লেখ আছে, লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।

অনেকে এই সময়ে ইতিকাফ পালন করেন—মসজিদে অবস্থান করে ইবাদতে সময় দেন।

রমজানের শেষে কী হয়?

রমজান শেষে তিন দিনব্যাপী উৎসব ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়।

পরিবারগুলো ভোরে উঠে ঈদের নামাজ আদায় করতে যায় এবং আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করে।

এটি খাবার, আনন্দ ও শিশুদের উপহার পাওয়ার সময়। ঘরবাড়ি সাজানো হয়।

অনেকে কবরস্থানে গিয়ে প্রয়াত স্বজনদের জন্য দোয়াকরেন।

 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়